ঈদের আগেই ৫ কোটি পরিবার পাচ্ছে ‘ফ্যামিলি কার্ড’—নগদ সহায়তার বড় ঘোষণা সরকারের! 🔥
ঈদের আগেই দেশের অতিদরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষের হাতে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ তুলে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। পাইলট প্রকল্প হিসেবে প্রথম ধাপে এই কার্যক্রম শুরু হবে বলে জানিয়েছেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক মন্ত্রী আব্দুল আউয়াল মিন্টু। বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে আয়োজিত এক আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ তথ্য জানান। বৈঠকে ফ্যামিলি কার্ড চালুর সার্বিক কর্মপরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হয় এবং দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য বিভিন্ন মন্ত্রণালয়কে দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়া হয়।
মন্ত্রী জানান, আসন্ন ঈদের আগেই পরীক্ষামূলকভাবে সবচেয়ে হতদরিদ্র পরিবারগুলোর মধ্যে এই কার্ড বিতরণ করা হবে। সরকার চায়, উৎসবের সময় যেন আর্থিক সংকটে থাকা পরিবারগুলো কিছুটা স্বস্তি পায়। তাই প্রশাসনিক জটিলতা কমিয়ে দ্রুততম সময়ে সুবিধাভোগীদের হাতে কার্ড পৌঁছে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে তালিকা প্রণয়ন, যাচাই-বাছাই এবং বিতরণ প্রক্রিয়া সমন্বয়ের জন্য তাৎক্ষণিক প্রস্তুতি নিতে বলা হয়েছে।
বৈঠকে উপস্থিত সমাজকল্যাণমন্ত্রী এ জেড এম জাহিদ হোসেন বলেন, ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে অর্থমন্ত্রীর নেতৃত্বে মন্ত্রিসভার একটি উপকমিটি গঠন করা হয়েছে। এই উপকমিটি প্রকল্পের আর্থিক কাঠামো, তহবিল ব্যবস্থাপনা এবং বাস্তবায়ন অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করবে। তিনি জানান, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ের মাধ্যমে একটি কেন্দ্রীয় ডাটাবেইস তৈরি করা হবে, যাতে প্রকৃত দরিদ্র পরিবারগুলো সঠিকভাবে চিহ্নিত হয় এবং কোনো ধরনের অনিয়ম বা তালিকাভুক্তির ভুল কমানো যায়।
তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বৈঠকের সিদ্ধান্ত তুলে ধরে জানান, প্রাথমিকভাবে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে প্রায় পাঁচ কোটি পরিবারকে এই ফ্যামিলি কার্ডের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। ধাপে ধাপে দেশের সব পরিবারকে অন্তর্ভুক্ত করার লক্ষ্য থাকলেও শুরুতে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন এমন পরিবারগুলোকে বেছে নেওয়া হবে। তিনি আরও বলেন, প্রত্যেক পরিবারের নারী সদস্যের নামে কার্ড ইস্যু করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে নারীর ক্ষমতায়ন ও পারিবারিক আর্থিক ব্যবস্থাপনায় তাদের ভূমিকা জোরদার হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সরকারি সূত্রে জানা যায়, ফ্যামিলি কার্ড শুধু একটি পরিচয়পত্র নয়; বরং এটি হবে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির একটি সমন্বিত প্ল্যাটফর্ম। এই কার্ডের মাধ্যমে নগদ সহায়তা, ভর্তুকি, খাদ্য সহায়তা কিংবা অন্যান্য সামাজিক সুবিধা সরাসরি উপকারভোগীর কাছে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে। এতে মধ্যস্বত্বভোগী বা অনিয়মের সুযোগ কমবে এবং স্বচ্ছতা বাড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কৃষিমন্ত্রী আমিন উর রশিদ জানান, আপাতত অতিদরিদ্র ও নিম্ন আয়ের পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে সরাসরি নগদ অর্থ সহায়তা দেওয়া হবে। ঠিক কত টাকা দেওয়া হবে, তা দু-একদিনের মধ্যেই নির্ধারণ করা হবে। অর্থের পরিমাণ নির্ধারণে পরিবারের সদস্যসংখ্যা, আয় পরিস্থিতি ও অন্যান্য সামাজিক সূচক বিবেচনায় নেওয়া হতে পারে। তিনি বলেন, সরকারের লক্ষ্য হলো সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ মানুষদের দ্রুত আর্থিক সহায়তার আওতায় আনা, যাতে তারা নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় মেটাতে সক্ষম হন।
বৈঠকে আরও আলোচনা হয়, কীভাবে স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর মাধ্যমে প্রকৃত সুবিধাভোগী নির্বাচন করা হবে। ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে প্রাথমিক তালিকা প্রস্তুত করে তা কেন্দ্রীয়ভাবে যাচাই করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে তথ্য সংরক্ষণ ও হালনাগাদ করার উদ্যোগও রয়েছে। এতে একই পরিবার একাধিকবার সুবিধা পাওয়ার সম্ভাবনা কমবে।
সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করছেন, ফ্যামিলি কার্ড চালু হলে দেশের সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে একটি নতুন মাত্রা যোগ হবে। বর্তমানে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার মাধ্যমে বিচ্ছিন্নভাবে যে সহায়তা দেওয়া হয়, তা একটি সমন্বিত কাঠামোর আওতায় আনা সম্ভব হবে। দীর্ঘমেয়াদে এই কার্ড ব্যবহার করে শিক্ষা সহায়তা, স্বাস্থ্যসেবা ভর্তুকি কিংবা কৃষি প্রণোদনাও দেওয়া যেতে পারে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, প্রকল্পের সাফল্য অনেকটাই নির্ভর করবে সঠিক তালিকা প্রণয়ন ও স্বচ্ছ বিতরণ প্রক্রিয়ার ওপর। অতীতে বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে তালিকা নিয়ে বিতর্ক দেখা গেছে। তাই শুরু থেকেই কঠোর মনিটরিং ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। উপকমিটি এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোকে নিয়মিত অগ্রগতি প্রতিবেদন প্রকাশের পরামর্শও দেওয়া হয়েছে।
ঈদের আগে পাইলট প্রকল্প হিসেবে কার্ড বিতরণ সফল হলে পরবর্তী ধাপে সারাদেশে পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়ন করা হবে। সরকার আশা করছে, এই উদ্যোগের মাধ্যমে দেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠী আর্থিক নিরাপত্তার একটি ভিত্তি পাবে এবং সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থায় আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক কাঠামো গড়ে উঠবে। দ্রুত বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীরা জানিয়েছেন, প্রশাসনিক প্রস্তুতি প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে এবং খুব শিগগিরই মাঠপর্যায়ে কাজ শুরু হবে।
সব মিলিয়ে, ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি সরকারের দারিদ্র্য বিমোচন প্রচেষ্টায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সময়মতো সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে এটি লাখো পরিবারের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।